রাজশাহীতে এইচআইভি সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ২০১৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত রাজশাহীতে মোট ১৩৯ জন এইচআইভি আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৯২ জনই সমকামী, যা মোট আক্রান্তের ৬৬ দশমিক ১৮ শতাংশ। একই সময়ে রাজশাহী বিভাগের আট জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৯৪ জনে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল ও সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিভাগের মধ্যে সর্বোচ্চ আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছে সিরাজগঞ্জে, যেখানে রোগীর সংখ্যা ৩১০ জন।
রামেক হাসপাতালের তথ্য বলছে, ২০১৯ সাল থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ১২ হাজার ৮৫২ জনের এইচআইভি পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১১৫ জনের শরীরে ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষ ১০৫ জন, নারী ৯ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গ জনগোষ্ঠীর একজন। বৈবাহিক অবস্থার হিসেবে ৪৮ জন বিবাহিত ও ৬৭ জন অবিবাহিত। বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী আক্রান্ত রয়েছেন ৩৫ জন এবং ২৫ থেকে ৫০ বছর বয়সী ৮০ জন। এছাড়া প্রবাসফেরত আক্রান্তের সংখ্যা চারজন।
ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর বিশ্লেষণে দেখা যায়, শনাক্তদের মধ্যে সমকামী ৫৮ জন, যৌনকর্মীর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তি ৩৫ জন, তৃতীয় লিঙ্গ জনগোষ্ঠীর দুজন, যৌনকর্মী একজন, যক্ষ্মা রোগী দুজন এবং সাধারণ জনগোষ্ঠীর ১৪ জন রয়েছেন। অন্যদিকে সিভিল সার্জন কার্যালয় হাসপাতালের বাইরের আরও ৩৪ জন আক্রান্তের তথ্য দিয়েছে, যাদের সবাই সমকামী। তাদের মধ্যে ৩১ জন পুরুষ এবং তিনজন তৃতীয় লিঙ্গ জনগোষ্ঠীর সদস্য। দুই প্রতিষ্ঠানের তথ্য একত্র করলে দেখা যায়, রাজশাহীতে মোট শনাক্ত হওয়া আক্রান্তদের বড় অংশই সমকামী জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত।
রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বিভাগের আট জেলার মধ্যে সিরাজগঞ্জে সর্বোচ্চ ৩১০ জন আক্রান্ত রয়েছেন। এছাড়া রাজশাহীতে ১৩১ জন, বগুড়ায় ১০৯ জন, পাবনায় ৭৮ জন, নওগাঁয় ৬৫ জন, নাটোরে ৪৩ জন, জয়পুরহাটে ৩৭ জন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২১ জন আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছেন। বিভাগজুড়ে আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধির প্রবণতা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তাদের মতে, ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণ, সচেতনতার অভাব, সামাজিক সংকোচ এবং গোপন যোগাযোগব্যবস্থা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজশাহী নগরীর কয়েকটি নির্জন এলাকায় রাতে সমকামীদের নিয়মিত জমায়েত হয়। নগরীর সি অ্যান্ড বি মোড় (শিমলা), কোর্ট স্টেশন, ডিঙাডোবা, ফুলতলাসহ পদ্মাপাড়ের বিভিন্ন স্থানের নাম স্থানীয়ভাবে আলোচনায় রয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ভিত্তিক বিভিন্ন গোপন গ্রুপ ও নেটওয়ার্কের মাধ্যমেও যোগাযোগ বাড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তিনির্ভর এসব যোগাযোগব্যবস্থা সংক্রমণ শনাক্ত ও প্রতিরোধ কার্যক্রমকে আরও জটিল করে তুলছে।
এইচআইভি নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘আপোস’-এর প্রকল্প ব্যবস্থাপক এস এন আব্দুল্লাহ আল রেজা বলেন, এইচআইভি আক্রান্তদের সামাজিকভাবে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হয়, যা তাদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। অন্যদিকে রামেক হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. মেহেদী হাসান ভূঁইয়া বলেন, এইচআইভি শুধু যৌন সম্পর্কের মাধ্যমেই নয়; অনিরাপদ রক্ত গ্রহণ, একই সিরিঞ্জ একাধিক ব্যক্তির ব্যবহার এবং মা থেকে শিশুর শরীরেও ছড়াতে পারে। এদিকে রামেক হাসপাতালের এইচআইভি টেস্টিং অ্যান্ড কাউন্সেলিং সেন্টারের মুখপাত্র ডা. ইব্রাহিম মো. শরফ জানিয়েছেন, আক্রান্তদের শনাক্ত হওয়া ইতিবাচক বিষয়, কারণ এতে তারা চিকিৎসার আওতায় আসছেন এবং সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমছে। তিনি জানান, রাজশাহীতে চালু হওয়া এআরটি সেন্টারে বর্তমানে চিকিৎসা, ওষুধ ও কাউন্সেলিং সেবায় কোনো সংকট নেই।
রাজশাহী ভয়েস
Rajshahi Voice একটি আধুনিক, স্বাধীন ও দায়িত্বশীল ডিজিটাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম, যার মূল লক্ষ্য রাজশাহীকে সঠিকভাবে রিপ্রেজেন্ট করা এবং দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরা। রাজশাহীর ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনধারাকে প্রামাণ্য ও বস্তুনিষ্ঠভাবে উপস্থাপন করাই আমাদের প্রধান অঙ্গীকার।